ব্যবসায় সফল হতে পড়ুন এই ৩টি বই | Business Growth Books
যে ৩টি বই আমার ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে: কিছু অসাধারণ শিক্ষা
আজ আমি আমার পড়া সেরা তিনটি বই নিয়ে কথা বলব, যা থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো আমার ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক জীবনে অসাধারণ পরিবর্তন এনেছে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই তিনটি বইয়ের মধ্যে দুটিই বাংলাদেশি লেখকের এবং একটি অনুবাদ করা। উদ্যোক্তা হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের ব্যবসা ও ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সংগ্রাম করি। অনেক সময় মনে হয়, অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও কোথাও যেন আটকে আছি। আমার ক্ষেত্রে, এই বইগুলো থেকে পাওয়া কয়েকটি যুগান্তকারী শিক্ষা আমার চিন্তাভাবনার মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছে। চলুন, সেই তিনটি শিক্ষা আপনাদের সাথে শেয়ার করি।
--------------------------------------------------------------------------------
১. টাকার চেয়েও বড় কিছু: রিজিকের সঠিক ধারণা
এই প্রথম শিক্ষাটি আমি পেয়েছি "দ্যা গ্রেটেস্ট এন্টারপ্রেনার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" বইটি থেকে। এই বইটি পড়ার পর থেকে রিজিক নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা একেবারেই দূর হয়ে গেছে।
আমরা কঠোর পরিশ্রম করি টাকা উপার্জনের জন্য। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা বলছেন, টাকা-পয়সা বা আর্থিক সচ্ছলতা হলো রিজিকের সর্বনিম্ন স্তর। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন, "আমি তোমাদেরকে পৃথিবীতে ঠাই দিয়েছি এবং তোমাদের জন্য তাতে রেখেছি জীবন উপকরণ। তোমরা অল্পতেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।"
বইটির মূল ধারণাটি হলো, রিজিক আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত, কিন্তু তা আপনার প্রচেষ্টার উপর শর্তযুক্ত ("তালাশ করার শর্তে রিজিক কিন্তু নির্ধারিত")। এর জন্য বসে থাকলে চলবে না, চেষ্টা করা বাধ্যতামূলক। এই প্রসঙ্গে একটি শক্তিশালী উদ্ধৃতি হলো:
হালাল রিজিক অন্বেষণ করা দ্বীনের ফরজগুলোর পর অন্যতম ফরজ।
বইটি অনুযায়ী রিজিকের বিভিন্ন স্তর রয়েছে, যা একজন উদ্যোক্তার মানসিকতাকে বদলে দিতে পারে। স্তরগুলো হলো:
- সর্বনিম্ন স্তর: আর্থিক সচ্ছলতা
- আবশ্যক স্তর: ঈমান
- পূর্ণাঙ্গ স্তর: আল্লাহ তাআালার সন্তুষ্টি
- সর্বোত্তম স্তর: পূণ্যবতী স্ত্রী এবং নেককার সন্তান
এই দৃষ্টিভঙ্গিটি বোঝার পর থেকে আমার নিজের ব্যবসার আর্থিক চাপ নিয়ে দুশ্চিন্তা কমেছে এবং আমি আরও বেশি অর্থপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে পেরেছি।
--------------------------------------------------------------------------------
২. প্রশ্ন বদলান, ফলাফল বদলে যাবে: সেরা মানুষ খুঁজে বের করার কৌশল
দ্বিতীয় শিক্ষাটি এসেছে স্টিভেন বার্টলেটের 'দ্যা ডায়রি অফ এ সিইও' থেকে—এমন একটি বই যা আমি আক্ষরিক অর্থেই দাগিয়ে দাগিয়ে পড়েছি। বইটি অনুবাদ করেছেন নওশরা আলী ভাই।
উদ্যোক্তা হিসেবে আমাদের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো, যেকোনো কাজ সামনে এলে আমরা ভাবি, "এই কাজটাকে আমি কিভাবে করব?"
কিন্তু বইটি একটি শক্তিশালী বিকল্প প্রশ্ন করতে শেখায়: "এই কাজটা আমার হয়ে সবথেকে ভালো কে করতে পারবে?"
প্রশ্নের এই সাধারণ পরিবর্তন যেকোনো ব্যবসার জন্য গেম-চেঞ্জার হতে পারে। এটি কাজ ডেলিগেট করতে, দক্ষতা বাড়াতে এবং ব্যবসাকে বড় করতে সাহায্য করে। এই ধারণার সমর্থনে বইটিতে স্টিভ জবসের দর্শন তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, 'A+' ক্যাটাগরির লোক নিয়োগ করে তাদের ওপর কাজ ছেড়ে দিতে হবে, তাদের বলতে হবে না কী করতে হবে, বরং তারাই বলে দেবে কোম্পানির জন্য কী ভালো হবে।
পাশাপাশি, বইটি শারীরিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। জীবনে যতই সফলতা আসুক না কেন, শরীর সুস্থ না থাকলে সেই সফলতা উপভোগ করা যায় না।
--------------------------------------------------------------------------------
৩. যে ৫টি মারাত্মক ভুলে উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন
তৃতীয় শিক্ষাটি আমি নিয়েছি কোচ কাঞ্চনের লেখা "ক্যাশ মেশিন" বইটি থেকে। বইটির সাব-টাইটেলটিও বেশ আকর্ষণীয়: "6 কোটি টাকার বিজনেস সিক্রেট"।
এই বইটিতে উদ্যোক্তাদের করা সাধারণ কিন্তু ভয়াবহ পাঁচটি ভুলের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। ভুলগুলো হলো:
১. শুধু পণ্য বা সার্ভিসে ফোকাস করা: অনেক উদ্যোক্তা কেবল তাদের পণ্য বা সেবা নিয়েই পড়ে থাকেন এবং ব্যবসার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক, যেমন—মার্কেটিং, সেলস বা ম্যানেজমেন্টকে উপেক্ষা করেন।
২. একাই সবকিছু করা: ব্যবসার শুরুতে অনেকেই "চিফ এভরিথিং অফিসার" হয়ে যান। তারা মনে করেন, তাদের চেয়ে ভালো কাজটি আর কেউ করতে পারবে না। ডেলিগেট না করার এই প্রবণতা ব্যবসার বৃদ্ধিকে থামিয়ে দেয়।
৩. টাকাকেই সব সমস্যার সমাধান ভাবা: টাকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি ব্যবসার সব সমস্যার সমাধান নয়। অনেক সময় সঠিক কৌশল, দক্ষ টিম বা নতুন স্কিল টাকার চেয়েও বেশি জরুরি হয়ে ওঠে।
৪. মানি ম্যানেজমেন্টে গাফিলতি করা: এটি সবচেয়ে মারাত্মক ভুলগুলোর একটি। আয় যতই হোক না কেন, যদি সঠিকভাবে অর্থ ব্যবস্থাপনা করা না যায়, তাহলে যেকোনো ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
৫. বিজনেস স্কিল না শেখা: ব্যবসা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। সময়ের সাথে সাথে নতুন স্কিল না শিখলে এবং নিজেকে আপডেট না রাখলে ব্যবসায় পিছিয়ে পড়াটা অবশ্যম্ভাবী।
এই বই থেকে পাওয়া একটি গল্প আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। কোচ কাঞ্চন একবার এমন একজন উদ্যোক্তাকে কাউন্সেলিং করছিলেন যিনি ব্যবসায় ২২ কোটি টাকা লস করেছেন। কোচ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন কী দিয়ে?" উত্তর এলো, "জিরো থেকে।" তখন তিনি বোঝালেন, যে মানুষ শূন্য থেকে শুরু করতে পারে, তার জন্য এই ক্ষতি সামলে আবারও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি শেখায় যে, টাকার চেয়েও বড় হলো ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা।
--------------------------------------------------------------------------------
শেষ কথা
রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত থাকা, 'আমি কীভাবে করব' থেকে 'সেরা কে করবে'—এই প্রশ্নে যাওয়া, এবং উদ্যোক্তাদের সাধারণ ফাঁদগুলো এড়িয়ে চলা—এই তিনটি মানসিকতার পরিবর্তনই ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বই পড়া এবং সেখান থেকে পাওয়া জ্ঞানকে কাজে লাগানো যেকোনো ব্যবসায়ী, পেশাজীবী বা ছাত্রছাত্রীর জন্য রূপান্তরকারী হতে পারে।
আপনার পড়া কোন বইটি আপনার চিন্তাভাবনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে? কমেন্টে আমাদের জানান।

