২০-৪০ বছর বয়সে এই ১টি কাজ করলে আপনার জীবন হবে সবার থেকে আলাদা
খালিদ ফারহানের লাইফ প্ল্যানিং গাইড: জীবন বদলে দেওয়া ৬টি শিক্ষা
১.০ ভূমিকা: আপনার ভাবনার শুরু এখানেই
আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষই পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি পাওয়ার বাইরে জীবন নিয়ে খুব বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা করে না। জীবনটা যেন স্রোতের সাথে ভেসে চলা এক নৌকা। কিন্তু জীবনকে কি পরিকল্পিতভাবে সাজানো যায় না? খালিদ ফারহান তার "লাইফ ম্যাপিং" ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, জীবনের প্রতিটি পর্যায়কে কতটা সুচিন্তিতভাবে ডিজাইন করা সম্ভব। এই পোস্টে আমরা তার জীবন পরিকল্পনার গভীর থেকে এমন কিছু আশ্চর্যজনক এবং যুগান্তকারী শিক্ষা তুলে ধরব, যা আপনাকে আপনার নিজের জীবনকে নতুন করে সাজাতে ভাবতে বাধ্য করবে।
২.০ শিক্ষা ১: স্কুল-কলেজের সাইড হাসল টাকা আয়ের জন্য নয়, নিজেকে খোঁজার জন্য
স্কুল বা কলেজে থাকাকালীন সাইড হাসল বা ছোটখাটো উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য টাকা উপার্জন করা নয়—এই ধারণাটি প্রচলিত চিন্তার একদম বিপরীত। খালিদ ফারহানের মতে, এই সময়ের মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন বিষয় পরখ করে দেখা এবং নিজের আসল প্যাশন বা আগ্রহ খুঁজে বের করা। তবে জীবন উপভোগ করার এই যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমানা মনে রাখতে হবে: আপনার আনন্দ যেন নিজের বা অন্য কারো জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ না হয়।
অনেকেই এই বয়সে টাকার মোহে আটকা পড়ে যান। যেমন, কেউ হয়তো একটি ইউটিউব চ্যানেল শুরু করল এবং সেটি সফল হতে শুরু করল। তখন সে তার সমস্ত মনোযোগ ও শক্তি সেখানেই দেয়। এর ফলে, পৃথিবীর আরও হাজারো সম্ভাবনার দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়, কারণ সে অর্থ উপার্জনের নেশায় অন্য কিছু অন্বেষণ করার সুযোগই পায় না।
এই মানসিকতার পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদী আত্মতৃপ্তির জন্য অত্যন্ত জরুরি। স্বল্পমেয়াদী লাভের চেয়ে নিজেকে আবিষ্কার করার এই সুযোগ অনেক বেশি মূল্যবান।
৩.০ শিক্ষা ২: ইউনিভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই চাকরির প্রস্তুতি শুরু
"ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি, তারাই তো সব শিখিয়ে দেবে"—এই ধারণার উপর বিশ্বাস রাখা একটি মারাত্মক ভুল এবং এক ধরনের ফাঁদ যা বহু গ্র্যাজুয়েটকে পিছিয়ে দেয়। বাস্তব পৃথিবীর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপর নির্ভর করা উচিত নয়। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির প্রথম দিন থেকেই একটি নির্দিষ্ট এবং বাস্তবসম্মত দক্ষতা (proper skill) অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
আধুনিক প্রযুক্তি এই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করে দিয়েছে। ChatGPT বা Gemini-এর মতো এআই টুলের সাহায্য নিয়ে আপনি যেকোনো বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য একটি কাস্টমাইজড এবং বিনামূল্যের শিক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করে নিতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্জিত দক্ষতা গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার আগেই বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা। ফ্রিল্যান্সিং, পার্ট-টাইম চাকরি বা নিজের কোনো সাইড বিজনেসের মাধ্যমে এই দক্ষতা যাচাই করে নেওয়া এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করা আপনার ক্যারিয়ারকে বহু ধাপ এগিয়ে দেবে।
৪.০ শিক্ষা ৩: মাসে মাত্র ১০০০ টাকার অবিশ্বাস্য শক্তি
আয় শুরু করার দিন থেকেই অল্প পরিমাণে বিনিয়োগ শুরু করার অভ্যাস আপনার ভবিষ্যৎকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। মাসে মাত্র ১০০০ টাকার মতো একটি ছোট অঙ্ক দিয়ে শুরু করলেও এর ফলাফল হতে পারে অবিশ্বাস্য। এর পেছনের মূল শক্তি হলো চক্রবৃদ্ধি বা কম্পাউন্ডিংয়ের জাদু।
বিনিয়োগের জন্য, যাদের আন্তর্জাতিক সুযোগ আছে তাদের জন্য S&P 500-এর মতো ইনডেক্স ফান্ড একটি ভালো মাধ্যম। আর যারা বাংলাদেশে আছেন, তাদের জন্য সঞ্চয়পত্র বা ফিক্সড ডিপোজিট দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। যদিও এগুলো খুব উচ্চ রিটার্নের মাধ্যম নয়, কিন্তু একেবারেই বিনিয়োগ না করার চেয়ে এটি নিঃসন্দেহে ভালো ("না থাকার থেকে ভালো")।
খালিদ ফারহান এর একটি শক্তিশালী উদাহরণ দিয়েছেন:
"...যদি আপনি এসএমপি 500 এ মাসে 1000 টাকা করে রাখেন তাহলে 20 বছরে ওটা 7 লাখ টাকা হয়ে যাবে 30 বছরে কিন্তু 7 লাখ টাকা হয়ে যাবে 22 লাখ টাকা এবং 40 বছরে ওটা হয়ে যাবে 63 লাখ টাকা।"
এই বিষয়টি এত impactful কারণ এটি প্রমাণ করে যে, জীবনে দেরিতে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করার চেয়ে আগে থেকে অল্প পরিমাণে কিন্তু নিয়মিত বিনিয়োগ করা অনেক বেশি শক্তিশালী। সময় এবং ধারাবাহিকতাই এখানে মূল চাবিকাঠি।
৫.০ শিক্ষা ৪: ক্যারিয়ারের প্রথম ৭ বছর দ্রুত শেখা, এরপর চাকরির পাশেই ব্যবসা
ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ঘটে কাজের প্রথম দশ বছরে—পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ৭৫%। এই সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল হলো "ক্যারিয়ার স্প্রিন্ট"। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো, ৭ থেকে ১০ বছর এমন পরিবেশে চাকরি করা যেখানে শেখার সুযোগ সবচেয়ে বেশি।
বিশেষ করে স্টার্টআপ সংস্কৃতির মতো ডাইনামিক পরিবেশে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন সমস্যা সমাধান করতে হয় এবং বিভিন্ন ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। এটি আপনাকে অল্প সময়ে অনেক বেশি দক্ষ করে তুলবে।
এই সময়কালে অর্জিত অভিজ্ঞতা, নেটওয়ার্ক এবং সঞ্চয়কে ভিত্তি করে চাকরির পাশাপাশি নিজের ব্যবসা শুরু করতে হবে। যখন ব্যবসার আয় আপনার চাকরির বেতনের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে (যেমন দ্বিগুণ) বেশি হবে, শুধুমাত্র তখনই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
৬.০ শিক্ষা ৫: ৩০ থেকে ৫০: শুধু সম্পদ নয়, নিজের উত্তরাধিকার তৈরি করুন
জীবনের মধ্যভাগে এসে ফোকাস শুধু সম্পদ জমানো থেকে সরিয়ে নিজের উত্তরাধিকার বা লিগ্যাসি তৈরির দিকে নিয়ে যেতে হবে। এই বয়সের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন কিছু তৈরি করা, যা আপনার পরেও পৃথিবীতে টিকে থাকবে।
পুরনো দিনের একটি উপমার মাধ্যমে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে: একজন মানুষের জীবনে তিনটি কাজ করা জরুরি—একটি গাছ লাগানো, একটি বই লেখা এবং একটি সন্তান জন্ম দেওয়া। এই তিনটি জিনিসের প্রত্যেকটিই ব্যক্তিকে অতিক্রম করে ভবিষ্যতে টিকে থাকে। একইভাবে, এই সময়ে নিজের ব্যবসা বা এমন কোনো অবদান তৈরি করতে হবে যা একটি স্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
আপনার এতদিনের অর্জিত দক্ষতা, অর্থ, নেটওয়ার্ক এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জীবনের এই পর্যায়ে এসে হিসেব করে ঝুঁকি নেওয়ার জন্য আপনিই সবচেয়ে প্রস্তুত।
৭.০ শিক্ষা ৬: জীবনের শেষ অধ্যায়: প্রজ্ঞা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য
পঞ্চাশ বছর বয়সের পর জীবনটা হওয়া উচিত এমন, যেখানে আপনি টাকার প্রয়োজনে কাজ করবেন না, বরং নিজের আনন্দের জন্য করবেন। এই সময়ের মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের অর্জিত প্রজ্ঞা ও জ্ঞান অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া এবং আপনি জীবনে যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, অন্যরা যেন তা এড়াতে পারে সেজন্য তাদের সাহায্য করা।
এই পর্যায়ে এসে জীবনের একটি গভীর উদ্দেশ্য পূরণ করার কথা বলা হয়েছে—তা হলো মানুষের 'হক' বা প্রাপ্য অধিকার মেটানো। হতে পারে সেটা আপনার স্কুলের আইসক্রিম বিক্রেতা, যার আপনার উপর একটি হক রয়েছে। বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়ার চেয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে বেশি তৃপ্তি ও সন্তুষ্টি পাওয়া যায়।
৮.০ উপসংহার: আপনার জীবন আপনারই প্রকল্প
খালিদ ফারহানের এই জীবন দর্শন আমাদের শেখায় যে, জীবনকে ভাগ্য বা পরিস্থিতির হাতে ছেড়ে না দিয়ে একটি প্রকল্পের মতো করে সচেতনভাবে ডিজাইন করা সম্ভব। প্রতিটি পর্যায়ের জন্য সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগোলে একটি অর্থপূর্ণ এবং সফল জীবন যাপন করা যায়। এখন প্রশ্ন হলো:
এই মুহূর্ত থেকে আপনার জীবনকে ম্যাপ করার জন্য প্রথম কোন পদক্ষেপটি আপনি নেবেন?

