দ্রুত ধনী হবার 7টি নিয়ম! | 7 Rules of Saving | Become Rich Fast | Richest Man in Babylon Lessons
প্রাচীন ব্যাবিলন থেকে আজকের ধনীরা: সম্পদ তৈরির যে গোপন সূত্রগুলো আপনার জানা দরকার
ভূমিকা: কেন কেউ ধনী হয় আর কেউ নয়?
কখনো ভেবে দেখেছেন, কেন একই রকম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জীবন শুরু করার পরেও কিছু মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক হয়, আর অন্যরা সারাজীবন আর্থিক সংগ্রামের মধ্যে কাটিয়ে দেয়? এর উত্তর কোনো আধুনিক আবিষ্কার নয়, বরং এটি ৫০০০ বছরের পুরনো এক জ্ঞান যা প্রাচীন ব্যাবিলনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি আরকাদের জীবন থেকে শুরু করে আজকের সফলতম উদ্যোক্তাদের কৌশলের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
ভাগ্য বা লটারি দিয়ে কেউ স্থায়ীভাবে ধনী হতে পারে না। সম্পদ তৈরি করা একটি সিস্টেম বা পদ্ধতি, যা নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের উপর ভিত্তি করে চলে। এই নিয়মগুলো সময়ের সাথে বদলায়নি। এই আর্টিকেলে আমরা প্রাচীন ব্যাবিলনের সেই কালজয়ী জ্ঞান এবং আধুনিক মিলিওনেয়ারদের বাস্তব কৌশলগুলোকে একত্রিত করে কয়েকটি সহজ ও কার্যকরী সূত্রে তুলে ধরব। এই সূত্রগুলো আপনাকে দেখাবে, সম্পদ তৈরি করা কোনো জাদু নয়, বরং এটি একটি শেখার মতো দক্ষতা।
১. আপনার আয়ের একটি অংশ সঞ্চয় করুন: কিন্তু আসল রহস্যটা অন্য জায়গায়
ব্যাবিলনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি আরকাদের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মটি ছিল একদম সহজ: "তোমার আয়ের কমপক্ষে দশ ভাগের এক ভাগ সবসময় নিজের জন্য রাখবে।" অর্থাৎ, আপনি যা-ই উপার্জন করুন না কেন, তার কমপক্ষে ১০% প্রথমে সঞ্চয় করবেন এবং বাকি ৯০% দিয়ে আপনার সমস্ত খরচ চালাবেন। এই শৃঙ্খলাটিই সম্পদ তৈরির প্রথম ধাপ।
কিন্তু আসল গোপন সূত্রটি শুধুমাত্র যান্ত্রিকভাবে ১০% জমানো নয়, বরং এর পেছনের মানসিক পরিবর্তন। সাধারণ মানুষ মাস শেষে খরচ করার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা সঞ্চয় করার চেষ্টা করে এবং বেশিরভাগ সময়ই কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। অন্যদিকে, ধনী ব্যক্তিরা আয় করার সাথে সাথেই সঞ্চয়ের অংশটি সরিয়ে রাখে এবং বাকি টাকা দিয়ে চলার পরিকল্পনা করে। তারা সঞ্চয়কে একটি বাধ্যতামূলক খরচ হিসেবে দেখে, ঐচ্ছিক কিছু হিসেবে নয়। এই মানসিক পরিবর্তন—আগে সঞ্চয়, পরে খরচ—সাধারণ অভ্যাসকে একটি শক্তিশালী সম্পদ তৈরির হাতিয়ারে পরিণত করে।
২. আপনার টাকাকে কাজে লাগান: তাকে আপনার জন্য সৈন্য বানান
শুধুমাত্র টাকা জমানো আপনাকে গরীব হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু ধনী করতে পারে না। সম্পদ তৈরির দ্বিতীয় ধাপ হলো জমানো টাকাকে আপনার জন্য কাজ করানো। আরকাদ তার তৃতীয় নিয়মে বলেছেন, “Make thy gold multiply” অর্থাৎ তোমার সোনাকে বহুগুণ বাড়াও। তিনি নিজে তার জমানো প্রথম অর্থ একজন ঢাল-নির্মাতাকে বিনিয়োগ হিসেবে দিয়েছিলেন এবং সেই বিনিয়োগ থেকে নিয়মিত লাভ পেতেন।
এই প্রাচীন ধারণাটিই আজকের যুগের বিনিয়োগ বা ইনভেস্টিং। আপনার সঞ্চিত অর্থকে অলসভাবে ফেলে না রেখে এমন জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে যেখানে তা নিজে থেকেই আরও অর্থ উপার্জন করতে পারে। আপনার টাকা তখন আপনার "গোলাম" বা "সৈন্য" হয়ে যায়, যা দিনরাত আপনার জন্য কাজ করে। যেমনটা বলা হয়েছে:
সেই প্রতিটা টাকা যে টাকাটা তুমি সেভ করে একটি ভালো জায়গায় ইনভেস্ট করো সেটা চিরদিনের জন্য তোমার গোলাম হয়ে যাবে আর কম্পাউন্ডিং এর কারণে তার সঙ্গে সঙ্গে তার সন্তানরাও চিরদিন তোমার জন্যই কাজ করবে।
৩. ঝুঁকি মানেই লোকসান নয়: সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কিছুই না করা
বিনিয়োগের কথা শুনলেই অনেকে লোকসানের ভয়ে পিছিয়ে যায়। আরকাদ তার চতুর্থ নিয়মে মূলধনকে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করার উপর জোর দিয়েছিলেন। আধুনিক বিশ্বের সেরা বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটও একই কথা বলেন: "Rule Number One: Don't lose money."
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আপনি কোনো ঝুঁকিই নেবেন না। আজকের পৃথিবীতে মুদ্রাস্ফীতির (inflation) কারণে, আপনার টাকা অলসভাবে ফেলে রাখা মানে তার ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে কমে যাওয়া। অর্থাৎ, কোনো ঝুঁকি না নেওয়াটাই সবচেয়ে বড় আর্থিক ঝুঁকি। এর সমাধান হলো আর্থিক শিক্ষা অর্জন করা। মূল লক্ষ্য ঝুঁকি এড়িয়ে চলা নয়, বরং জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ঝুঁকিকে বোঝা এবং একে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। না জেনে বড় ঝুঁকি নেওয়া বোকামি, কিন্তু কিছুই না করাটা তার চেয়েও বড় লোকসান।
৪. আপনার সেরা বিনিয়োগ আপনি নিজেই: দক্ষতার চেয়ে বড় সম্পদ আর নেই
আপনার সম্পদ তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার কী? আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয়, আপনার নিজের জ্ঞান এবং দক্ষতা। আরকাদ তার সপ্তম নিয়মে বলেছেন, "Increase thy ability to earn" অর্থাৎ তোমার উপার্জন করার ক্ষমতা বাড়াও। তিনি এক যুবককে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, কেবল বেশি টাকা আয় করার প্রবল ইচ্ছা থাকলেই হবে না, সেই বাড়তি আয়ের যোগ্য হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করতে হবে।
এই কথাটি আজকের দিনে আরও বেশি সত্যি। আধুনিক মিলিওনেয়ারদের প্রায় ৯০% সেলফ-মেড, অর্থাৎ তারা নিজেদের পরিশ্রমে ধনী হয়েছেন। যেমন, ইলন মাস্ক নিজে কোডিং শিখে তার প্রথম কোম্পানি শুরু করেছিলেন, যা তাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছানোর পথ তৈরি করে দিয়েছে। আপনার দক্ষতা যত বাড়বে, আপনার মূল্য তত বাড়বে এবং আপনার আয়ের সম্ভাবনাও ততটাই প্রসারিত হবে। এই প্রসঙ্গে আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি একটি শক্তিশালী কথা বলেছিলেন, যা আজও সত্য: আপনার সেরা বিনিয়োগ আপনি নিজেই।
৫. একটি আয়ের উৎসের উপর নির্ভর করা বিপজ্জনক: আপনার আয়ের জাল তৈরি করুন
আপনি যদি শুধুমাত্র একটি চাকরির বেতনের উপর নির্ভর করে থাকেন, তবে আপনি একটি বড় ঝুঁকির মধ্যে আছেন। কারণ সেই চাকরিটি যেকোনো মুহূর্তে চলে যেতে পারে, এবং আপনার আয়ের উৎস শূন্য হয়ে যাবে। যদিও একাধিক আয়ের উৎসের ধারণাটি আধুনিক শোনায়, এর মূলনীতি কিন্তু প্রাচীন। আরকাদ তার প্রধান পেশা, অর্থাৎ একজন লিপিকার হিসেবে আয়ের পাশাপাশি তার সঞ্চয়কে ঢাল-নির্মাতার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন। এটিই ছিল তার দ্বিতীয় আয়ের উৎস তৈরির প্রথম পদক্ষেপ—তার প্রথম "প্যাসিভ ইনকাম"।
আধুনিক মিলিওনেয়াররা এই ঝুঁকি কমানোর জন্য এই একই নীতি আরও বড় আকারে প্রয়োগ করেন। একটি আমেরিকান গবেষণা অনুযায়ী, মিলিওনেয়ারদের গড়ে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন আয়ের উৎস থাকে। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস শুধুমাত্র অ্যামাজন থেকেই আয় করেন না; তার আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে ব্লু অরিজিন, হোল ফুডস এবং আরও বিভিন্ন বিনিয়োগ। একটি উৎস বন্ধ হয়ে গেলেও অন্যগুলো তার আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। তাই শুধুমাত্র একটি উৎসের উপর নির্ভর না করে, আরকাদের মতো আপনার প্রথম অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরির কথা ভাবুন।
উপসংহার: আপনার যাত্রা আজই শুরু করুন
সম্পদ তৈরি করা কোনো রহস্যময় ব্যাপার বা ভাগ্য নয়, এটি একটি পদ্ধতি যা সহজ এবং কালজয়ী কিছু নিয়মের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যে নীতিগুলো ব্যাবিলনের মাটির ফলকে খোদাই করে সম্পদ তৈরি করেছিল, সেই একই নীতিগুলো আজ ডিজিটাল স্টক এক্সচেঞ্জে সম্পদ তৈরি করছে। আপনার অর্থ কেবল খরচ করার জিনিস নয়; এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার যা সঠিকভাবে পরিচালনা করলে আপনার হয়ে সারাজীবন কাজ করবে।
এই সূত্রগুলো জানাটাই যথেষ্ট নয়, আসল পরিবর্তন আসবে এগুলোকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে। তাই আর দেরি না করে নিজের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিজের হাতে তুলে নিন।
আপনার ধনী হওয়ার যাত্রায়, আজ থেকে কোন সূত্রটি আপনি প্রথম প্রয়োগ করবেন?

